Close

গাছের প্রাণ: জগদীশ বসুর আবিষ্কার ও গাছের কথোপকথন!

গাছের কি জীবন রয়েছে

গাছের কি অনুভূতি রয়েছে ?

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার বাগানের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিরও অনুভূতি আছে? সেও কি আমাদের মতো ব্যথা পায়, কষ্ট পায়, নাকি আপন মনে প্রকৃতির গান গেয়ে চলে? ছোটবেলায় আমরা রূপকথার গল্পে শুনেছি গাছের কথা বলার কাহিনি। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? চলুন, আজ আমরা এই রহস্যের গভীরে ডুব দেই!

গাছের প্রাণ: রূপকথা নাকি বিজ্ঞান?

আমরা সবাই জানি, গাছপালা খাদ্য তৈরি করে, বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছাড়ে। কিন্তু প্রাণের স্পন্দন? সে তো শুধু মানুষ আর পশু-পাখিদের মধ্যেই থাকার কথা, তাই না? তবে, ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছিলেন, গাছেরও প্রাণ আছে!

জগদীশ চন্দ্র বসুর যুগান্তকারী আবিষ্কার

জগদীশ চন্দ্র বসু, যাঁর নাম শুনলেই বিজ্ঞান আর বিস্ময় একসঙ্গে মনে আসে। তিনি ছিলেন একাধারে পদার্থবিদ, উদ্ভিদবিদ, এবং জীববিজ্ঞানী। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন মানুষ মনে করত শুধু জীবজন্তুদেরই অনুভূতি আছে, তখন তিনি প্রমাণ করলেন গাছেরও প্রাণ আছে, তারা ব্যথা অনুভব করতে পারে!

জগদীশ চন্দ্র বসু ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ নামক একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন যে গাছেরা উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। ক্রেসকোগ্রাফ গাছেদের সামান্যতম স্পন্দনকেও লক্ষ করতে পারত। তিনি দেখান, গাছ কাটলে বা আঘাত করলে তারা মানুষের মতোই কষ্ট পায় এবং এর প্রতিক্রিয়া দেখায়।

গাছেরা কিভাবে কথা বলে?

আচ্ছা, গাছেরা তো আর আমাদের মতো মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না, তাহলে তারা কিভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে? কিভাবে অন্য গাছের সাথে যোগাযোগ রাখে? বিজ্ঞান কিন্তু এরও উত্তর দিয়েছে!

রাসায়নিক সংকেত: নীরব ভাষার প্রকাশ

গাছেরা একে অপরের সাথে কথা বলার জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে। যখন কোনো গাছ আক্রান্ত হয়, তখন সে বাতাস বা মাটির মাধ্যমে অন্য গাছেদের সতর্ক করে দেয়।

উদাহরণস্বরূপ:
  • একটি গাছে যদি কোনো পোকা আক্রমণ করে, তখন সে ‘ volatile organic compounds (VOCs)’ নামক রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে।
  • এই VOCs অন্য গাছগুলোকে পোকামাকড়ের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
  • আক্রান্ত গাছের কাছাকাছি থাকা গাছেরা তখন তাদের পাতায় টারপেনয়েডস (terpenoids) এবং অ্যালকালয়েডস (alkaloids) তৈরি করে, যা পোকাদের জন্য বিষাক্ত।

মাইক্রোরাইজা: মাটির নিচের ইন্টারনেট

মাইক্রোরাইজা হলো এক ধরনের ছত্রাক, যা গাছের মূলের সাথে মিশে থাকে। তারা গাছের মূলকে মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করতে সাহায্য করে এবং বিনিময়ে গাছ থেকে শর্করা গ্রহণ করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই মাইক্রোরাইজার মাধ্যমে গাছেরা একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করে।

মাইক্রোরাইজার মাধ্যমে যোগাযোগের উদাহরণ:

  • একটি গাছ যদি খনিজ লবণ বা জলের অভাবে ভোগে, তবে সে মাইক্রোরাইজার মাধ্যমে অন্য গাছকে সেই খবর পাঠাতে পারে।
  • তখন অন্য গাছটি তার মূল থেকে কিছু লবণ বা জল পাঠিয়ে প্রথম গাছটিকে সাহায্য করতে পারে। অনেকটা যেন মাটির নিচে একটা অদৃশ্য ইন্টারনেট পাতা!

আলোর সংকেত

কিছু গাছ আলোর মাধ্যমেও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা বিশেষ ধরনের প্রোটিন ব্যবহার করে আলো তৈরি করে এবং সেই আলোর মাধ্যমে অন্য গাছকে বিপদ বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সংকেত দেয়।

গাছের অনুভূতি: বিজ্ঞানীদের মতামত

যদিও জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কার আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তবুও অনেক বিজ্ঞানী প্রথমে এটি মানতে চাননি। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এখন গাছের অনুভূতি নিয়ে অনেক নতুন তথ্য দিচ্ছে।

উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা (Plant Physiology) কী বলে?

উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা হলো বিজ্ঞানের সেই শাখা, যেখানে গাছের শরীর, বৃদ্ধি এবং কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই শাখার বিজ্ঞানীরা এখন প্রমাণ করছেন যে গাছেরাও ব্যথা অনুভব করতে পারে, শিখতে পারে এবং মনে রাখতে পারে।

নতুন কিছু আবিষ্কার:

  • গাছের শরীরে ‘ ক্যালসিয়াম সিগনালিং (calcium signalling)’ নামক একটি প্রক্রিয়া আছে, যা অনেকটা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে।
  • এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছেরা দ্রুত তাদের শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে সংকেত পাঠাতে পারে।
  • বিজ্ঞানীরা আরও জানতে পেরেছেন যে গাছের মূলে ‘ব্রেইন-লাইক স্ট্রাকচার’ থাকে, যা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

তাহলে কি গাছও মানুষ বা প্রাণীদের মতো অনুভূতিপ্রবণ?

বিষয়টা ঠিক তা নয়। গাছের অনুভূতি আর আমাদের অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য আছে। আমাদের অনুভূতি আসে মস্তিষ্ক থেকে, কিন্তু গাছের কোনো মস্তিষ্ক নেই। তাদের অনুভূতি আসে রাসায়নিক সংকেত এবং শারীরিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

শেষ কথা

গাছের প্রাণ আছে, তারা কথা বলতে পারে – জগদীশ চন্দ্র বসুর এই আবিষ্কার আমাদের গাছপালা এবং প্রকৃতির প্রতি নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। গাছ আমাদের বন্ধু, আমাদের জীবনের অংশ। তাই তাদের রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আসুন, আমরা সবাই মিলে গাছ বাঁচাই, পরিবেশ বাঁচাই এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি।

এই আর্টিকেলটি আপনার কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানাতে বা অন্য কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করতে পারেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Leave a comment
scroll to top